আমিনুল ইসলাম হিরো : বাংলা পঞ্জিকার পহেলা ফাল্গুন মানেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। প্রকৃতিতে নতুন রঙের উচ্ছ্বাস, হৃদয়ে অনাবিল আনন্দ আর সংস্কৃতিতে প্রাণের উৎসব—সব মিলিয়ে দিনটি বাঙালির কাছে এক আলাদা আবেগের নাম। শীতের জড়তা কাটিয়ে বসন্ত যেন নিয়ে আসে উষ্ণতার মৃদু ছোঁয়া, কুসুমের সুবাস আর নতুন শুরুর প্রত্যাশা। ফাগুনের আগুন ঝড়ানো হাওয়া তখন নিঃশব্দে দোলা দেয় মন-প্রাণে।
ভোরের আলো ফুটতেই শহর থেকে গ্রাম সবখানেই দেখা যায় হলুদ আর বাসন্তী রঙের ছটা। নারীদের শাড়ি, পুরুষদের পাঞ্জাবি, কিশোরীদের খোঁপায় গাঁদা কিংবা কৃষ্ণচূড়া সবকিছুতেই বসন্তের রঙিন ছোঁয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্ম দিনটিকে ঘিরে আয়োজন করে গান, কবিতা, নৃত্য ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। চারপাশে ভেসে আসে চিরচেনা সুর
ওরে গৃহবাসী, খুলে দে রে দ্বার,
এলো যে বসন্ত দ্বারে…
রাজধানীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসন্তবরণ দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য; টিএসসি, বটতলা কিংবা রমনা পার্ক এলাকায় জমে ওঠে উৎসবমুখর পরিবেশ। রঙিন আবহে তরুণদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বসন্তের গান
পলাশ ও শিমুল,
আমার ঘুম কেন ভাঙালি…
এই সুর যেন নিদ্রিত অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে, মনে করিয়ে দেয় জীবন মানেই নতুন করে বাঁচা।
বসন্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের গভীর সম্পর্ক। প্রেম, জাগরণ ও নবজীবনের প্রতীক হয়ে বসন্ত এসেছে অসংখ্য গান-কবিতায়। মঞ্চে মঞ্চে ধ্বনিত হয়
রঙে ভরো, হে বসন্ত,
রাঙিয়ে দাও প্রাণ…
ফাগুনের আগুন ঝরানো দিনগুলো তাই শুধু ঋতুর পালাবদল নয়, এক গভীর নান্দনিক অনুভবেরও নাম।
গ্রামবাংলায় বসন্তের রূপ কিছুটা ভিন্ন, আরও নিবিড়। সরিষার হলুদ, শিমুল-পলাশের আগুনরাঙা, আম্রকুঞ্জে মুকুলের গন্ধ প্রকৃতির নিজস্ব আয়োজনে বসন্ত সেখানে আরও গভীর। কৃষকের মাঠে নতুন ফসলের স্বপ্ন, গৃহস্থের উঠোনে কচি পাতার দোলা—সবখানেই প্রাণের জাগরণ। যেন প্রকৃতি নিজেই গেয়ে ওঠে
ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়
ডাকে নবীন গানে…
তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বসন্তবরণে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়, ফটোসেশন, থিমভিত্তিক অনুষ্ঠান সব মিলিয়ে বসন্ত এখন একাধারে ঐতিহ্য ও ট্রেন্ডের মেলবন্ধন। ফুলের দোকানগুলোতেও থাকে বিশেষ ব্যস্ততা; গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা কিংবা কৃত্রিম ফুল সবকিছুরই বাড়তি চাহিদা। ফাগুনের আগুন ঝড়ানো আবহে রঙ আর অনুভূতির এই উৎসব যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
ঋতুচক্রের নিয়মে বসন্ত স্বল্পস্থায়ী, কিন্তু তার আবেদন চিরন্তন। প্রকৃতির এই নবজাগরণ মানুষকে মনে করিয়ে দেয় অন্ধকারের পরেই আলো, শীতের পরেই উষ্ণতা, ক্লান্তির পরেই নতুন উদ্যম। তাই ফুল ফুটুক বা না ফুটুক, বসন্ত আসে আশা, ভালোবাসা আর সৌন্দর্যের বার্তা নিয়ে।
পহেলা ফাল্গুন শুধু ঋতুর পরিবর্তনের দিন নয়; এটি বাঙালির রুচি, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের এক উজ্জ্বল প্রকাশ। বসন্তের এই রঙিন আবেশে প্রকৃতি যেমন সাজে নতুন করে, তেমনি মানুষও খুঁজে নেয় ভালোবাসা, আনন্দ আর ইতিবাচকতার নতুন ঠিকানা। ফাগুনের আগুন ঝড়ানো দিনে তাই হৃদয় জেগে থাকে এক অমলিন প্রত্যাশায় নতুনের, সুন্দর্যের, জীবনের।
ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত
